বাংলাদেশে নির্বাচন একটি সাংবিধানিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত। জনগণের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ ও নির্বাচনের সততা বজায় রাখতে কার্যকর আইন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া পরিচালনা ও তদারক করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (Election Commission of Bangladesh)। নির্বাচনী আচরণ ও অপরাধের শৃঙ্খলা রক্ষা করে মূলত নিম্নলিখিত আইনসমূহ—
- The
Representation of the People Order, 1972 (RPO)
- Election
Conduct Rules, 2008
- Code
of Conduct for Political Parties and Candidates, 2018
- Penal
Code, 1860
- Election
Officer (Special Provisions) Act, 1991 (সংশোধিত ২০২৫)
“নির্বাচন আইন, ১৯৭২ (Representation of the People Order,
1972 – President’s Order No. 155 of 1972)”
এই আইনগুলোর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
⚖️ ধারা ৭৪: বেআইনি নির্বাচন কার্য (Illegal Practices)
Representation of the People Order (RPO)-এর ধারা ৭৪ অনুসারে যে কোনো ব্যক্তি নিম্নলিখিত কাজ করলে বেআইনি নির্বাচন কার্য সংঘটিত করে—
যেমন: সরকারি কর্মচারীর সহায়তায় নির্বাচনী কার্য পরিচালনা, অযোগ্য হয়েও ভোট দেওয়া, একই কেন্দ্রে বা একাধিক কেন্দ্রে একাধিকবার ভোট দেওয়া, ভোটের সময় ব্যালট পেপার বাইরে নেওয়া বা অন্যকে এমন কাজে প্ররোচিত করা।
শাস্তি: এ অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কঠোর কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করা যায়।
⚖️ ধারা ৭৫: ঘুষ (Bribery)
যদি কেউ কোনো প্রার্থী বা ভোটারকে অর্থ, উপহার, চাকরি বা আর্থিক সুবিধা দেয় বা নেয়— ভোট বা প্রার্থিতা প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে— তবে সেটি ঘুষের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তি: এই অপরাধে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কঠোর কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। “Gratification”
শব্দটি অর্থ,
বিনোদন বা আর্থিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করে।
⚖️ ধারা ৭৭: জবরদস্তি বা ভয় দেখানো (Undue Influence & Intimidation)
ভোটারকে ভয় দেখানো, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রভাব খাটানো কিংবা হুমকি দিয়ে ভোট দিতে বা না দিতে বাধ্য করা হলে সেটি Undue Influence হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রযোজ্য।
⚖️ ধারা ৭৮: দুর্নীতি (Corrupt Practice)
যদি কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট ঘুষ, প্রলোভন, ভয় বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত করেন, তবে এটি দুর্নীতিপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা, এবং প্রার্থিতা বাতিলও হতে পারে।
⚖️ ধারা ৭৯: ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে প্রচারণা নিষিদ্ধ
ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র থেকে ৪০০ গজের মধ্যে প্রচারণা, ভোট চাওয়া, ভোটারকে প্রভাবিত করা বা অনুমতি ছাড়া ব্যানার–পতাকা টানানো নিষিদ্ধ।
শাস্তি: এ অপরাধে ৬ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
⚖️ ধারা ৮১: ভোটকেন্দ্রে জালিয়াতি ও কেন্দ্র দখল
ব্যালট পেপার, ইভিএম নষ্ট করা, ব্যালট বাক্স দখল করা,
জাল ভোট প্রদান বা ভোটগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা এই ধারার আওতাভুক্ত অপরাধ।
শাস্তি: সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা, আর যদি নির্বাচন কর্মকর্তা জড়িত থাকেন, তবে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রযোজ্য।
⚖️ ধারা ৮২: ভোটের গোপনীয়তা লঙ্ঘন
ভোটারকে প্রভাবিত করা,
ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছেন তা জানার চেষ্টা করা বা ভোটের তথ্য ফাঁস করা এই অপরাধের মধ্যে পড়ে।
শাস্তি: ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা।
⚖️ ধারা ৮৩: কর্মকর্তার গোপনীয়তা ভঙ্গ
Returning Officer, Presiding Officer, Polling Officer বা প্রার্থীর এজেন্ট যদি ভোটের গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করেন বা দায়িত্বে অবহেলা করেন,
তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
শাস্তি: ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা।
⚖️ ধারা ৪৪: ব্যালট পেপার পরিদর্শন (Inspection of Ballot Papers)
১️⃣ হাইকোর্ট বিভাগ প্রয়োজনে ব্যালট পেপারের counterfoil,
সার্টিফিকেট বা গণনাকৃত ব্যালট পেপার খোলার আদেশ দিতে পারে।
২️⃣ আদালত এ আদেশ বাস্তবায়নের সময় নির্দিষ্ট শর্ত দিতে পারে—যেমন কে,
কোথায়, কবে পরিদর্শন করবে।
৩️⃣ Returning Officer কর্তৃক ব্যালট পেপার আদালতে উপস্থাপন করলে তা নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই গণ্য হবে।
৪️⃣ কোনো ব্যালট পেপার ও তার counterfoil একসঙ্গে পাওয়া গেলে সেটি প্রমাণ করবে যে সংশ্লিষ্ট ভোটারই তা প্রদান করেছেন।
৫️⃣. এই ধারায় বলা হয়েছে, আদালতের অনুমতি ছাড়া কেউ ব্যালট পেপার বা সংশ্লিষ্ট নথি পরিদর্শন করতে পারবে না। হাইকোর্ট বিভাগ প্রয়োজনে প্রমাণের স্বার্থে ব্যালট পেপার খোলার আদেশ দিতে পারেন।
⚖️ নির্বাচনী ব্যয়ের অনিয়ম
RPO-এর ধারা ৪৪ ও ৪৫ অনুসারে কোনো প্রার্থী যদি নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করেন, ব্যয়ের হিসাব না দেন বা মিথ্যা হিসাব প্রদান করেন,
তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তি: ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
⚖️ মিথ্যা তথ্য প্রদান
RPO-এর ধারা ৮৩ অনুসারে মনোনয়নপত্র, হলফনামা বা ব্যয়ের হিসাবের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে—
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রযোজ্য।
⚖️ ভোটার তালিকায় জালিয়াতি
ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯অনুযায়ী ভোটার তালিকায় অবৈধভাবে নাম সংযোজন, পরিবর্তন বা অপসারণ করলে—
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা।
🏛️ নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ — ২০২৫ সালের সংশোধন
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১-এর সংশোধনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়, যার সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
সংশোধনের প্রধান দিকসমূহঃ ধারা ২, ৫ ও ৬ সংশোধন করা হয়েছে।
- ধারা ২: ‘নির্বাচন কর্মকর্তা’র সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
- ধারা ৫: দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের শাস্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- ধারা ৬: কমিশনের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া হালনাগাদ করা হয়েছে।
ধারা ৫ অনুসারে পরিবর্তন:
১️⃣ দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতির জন্য পূর্বে ১ বছর জেল বা ৫,০০০ টাকা জরিমানা থাকলেও এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ বছর জেল বা ১,০০,০০০ টাকা জরিমানা নির্ধারিত হয়েছে।
২️⃣ অসদাচরণের ক্ষেত্রে পূর্বে ৬ মাস জেল বা ২,০০০ টাকা জরিমানা ছিল,
নতুন সংশোধনে তা ১–৫ বছর জেল বা ২০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
নতুন খসড়ায় আরও বলা হয়েছে যে,
কোনো নির্বাচন কর্মকর্তা যদি কমিশন বা রিটার্নিং অফিসারের আদেশ পালন না করেন বা দায়িত্বে অবহেলা করেন,
তবে তাকে অসদাচরণকারী হিসেবে দণ্ডনীয় ধরা হবে।
⚖️ প্রশাসনিক পরিবর্তনসমূহ
২০২৫ সালের সংশোধনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯ এর ধারা ৩(৪) প্রতিস্থাপন করে নতুন “Election
Commission Service” গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রশাসনিক কাঠামো আরও স্বতন্ত্র ও দক্ষ হয়। তদুপরি, অর্থসংক্রান্ত আইন (দ্বিতীয় সংশোধন), ২০২৫-এ পরিবহন খাতের আয়কে final
taxable income হিসেবে নির্ধারণ এবং ভ্যাট অব্যাহতি সংক্রান্ত বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
✅ উপসংহার
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন কাঠামো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। Representation of the People Order,
1972 এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলো নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি কঠোর করেছে এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
২০২৫ সালের সংশোধনগুলো বিশেষত কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ন্যায়সঙ্গত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই সংস্কারগুলো সময়োপযোগী ও অপরিহার্য পদক্ষেপ।
📘 #নির্বাচনী_আইন #বাংলাদেশ_নির্বাচন #RPO1972 #ElectionLawBD #Democracy #ElectionCommissionBD